চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে গাড়ি গ্যারেজের এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রায় দুই দিন পর গতকাল বুধবার রাতে চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জের মহামায়া লেক এলাকার বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজ থেকে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. হাসান মোস্তফা স্বপন।
পুলিশের ভাষ্য, ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরোধের জেরে ওই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার মো. আবুল হাশেম (৫২) এবং আবুল হাশেমের জামাতা মো. আকরাম (৩৪) রয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ীর নাম মো. হেলাল উদ্দিন (৩৬)। তিনি পাঁচলাইশ মডেল থানার শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের পাশে একটি গাড়ির গ্যারেজ পরিচালনা করেন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আবুল হাশেম হেলাল উদ্দিনের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি ব্যবসায় ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। এর মধ্যে হেলাল তাঁকে ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আবুল হাশেম বিভিন্ন সময় হেলালকে হুমকি দিচ্ছিলেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় গত সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে আবুল হাশেমসহ সাত থেকে আটজন ব্যক্তি একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের সামনে যান। সেখানে হেলালকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি জানতে পেরে হেলালের স্ত্রী মোছাম্মাৎ জেসমিন আক্তার (৩৫) চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর স্বামীকে খুঁজতে থাকেন। পরদিন মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হেলালের মুঠোফোন নম্বর থেকে জেসমিনের নম্বরে ফোন করে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন বলে পুলিশ জানায়। টাকা না দিলে হেলালকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। পরে একই নম্বর থেকে আবার ফোন করে দ্রুত এক লাখ টাকা পাঠাতে বলা হয়।
এ ঘটনায় জেসমিন আক্তার পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৮৫, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
যেভাবে উদ্ধার
পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আকবরশাহ থানার উত্তর কাট্টলী এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে মামলার তদন্তে পাওয়া আসামি মো. শান্ত মিয়া (৩২)কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, শান্ত মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আবুল হাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আকবরশাহ থানার লতিফপুর এলাকা থেকে মো. আকরামকে গ্রেপ্তার করা হয়। আকরামের কাছ থেকে হেলালের ব্যবহৃত মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, শান্ত মিয়া ও আকরামকে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, হেলালকে জোরারগঞ্জ থানার মহামায়া লেক এলাকায় রাখা হয়েছে। এরপর মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা-পুলিশের সহায়তায় মহামায়া লেকের ভেতরে বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে হেলালকে উদ্ধার করা হয়।
এ সময় ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন মো. মঈন উদ্দিন রায়হান (২৯), আমজাদ হোসেন (৩৫), মাহবুব রহমান (২৬), মানিক হোসেন (৩০) ও মো. ফারুক (৩৪)। এ নিয়ে মামলায় মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাওনা টাকা উদ্ধারে অপহরণের অভিযোগ
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আবুল হাশেম ও হেলাল উদ্দিনের মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ছিল। আকরাম হলেন আবুল হাশেমের মেয়ের স্বামী।
পুলিশের দাবি, হেলালের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আবুল হাশেম ও আকরাম শান্ত মিয়াকে এক লাখ টাকা দিয়ে অন্যদের ভাড়া করেন। এরপর তাঁরা হেলালকে অপহরণ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

