পোলিওমুক্ত বিশ্ব গড়তে প্রতিটি শিশুর নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবায় সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
বিশ্ব পোলিও দিবস উপলক্ষে শনিবার (২৪ অক্টোবর) চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনকে কেন্দ্র করে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট ৬৫-এর রিপসা (RIPSA) টিম আয়োজিত বর্ণাঢ্য র্যালি ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রোটারিয়ান পিপি মানতাকা জামান কাপ্পী।
মেয়র বলেন, “পোলিও একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত হলে স্থায়ী পক্ষাঘাতের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। পোলিওর নির্দিষ্ট নিরাময়মূলক চিকিৎসা নেই; তবে যথাযথ টিকাদানের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই কোনো শিশুই যেন টিকাদানের আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক ভুল ধারণা দূর করাও জরুরি।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পোলিও নির্মূলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বশেষ বন্য পোলিও ভাইরাসজনিত রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৬ সালে।
২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে পোলিওমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ফলে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে নিয়মিত টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
মেয়র আরও বলেন, “পোলিও নির্মূল কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের পক্ষে একা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, চিকিৎসক, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”
রোটারি ইন্টারন্যাশনালের ভূমিকার প্রশংসা করে মেয়র বলেন, পোলিও নির্মূলে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। টিকাদান কার্যক্রমে সহায়তা, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে তারা বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবদান রাখছে। শুধু পোলিও নির্মূল নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও সামাজিক উন্নয়নেও রোটারির মানবিক কার্যক্রম প্রশংসনীয়। সরকারের পাশাপাশি এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কার্যকর অংশগ্রহণ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি বলেন, “একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি মনে করি, রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। টিকাদান এমন একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ, যা শিশুদের বহু প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। তাই টিকাদান সম্পর্কে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।” চট্টগ্রাম নগরীকে হেলদি সিটিতে রূপান্তরে টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে চসিক অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বী এবং রিপসা কমিটির অ্যাডভাইজার ও ডেপুটি কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর পিডিজি আব্দুল আহাদ। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০ জন সুবিধাবঞ্চিত নারীকে ১০টি সেলাই মেশিন হস্তান্তর করা হয়।
কর্মসূচির সার্বিক আয়োজন ও সমন্বয়ে ভূমিকা রাখেন কো-অর্ডিনেটর পিপি নজরুল ইসলাম নান্টু, পিপি মিনহাজ ইউ নাহিয়ান, পিপি ইব্রাহিম হাসান, ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর পিপি সুদীপ কুমার চন্দা, রেজিস্ট্রেশন চেয়ার পিপি তাহিয়া কবির, রেজিস্ট্রেশন কো-চেয়ার পিপি জাহিদুল ইসলাম এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর ও ইভেন্ট প্রমোশন চেয়ার পিপি হাসানুজ্জামান শান্টু।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন রিপসার সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর পিপি আবু তৈয়ব, পিপি মনিরুজ্জামান, পিপি ফেরদৌস আরা, সিনিয়র স্পেশাল এইড পিপি আফতাব উদ্দিন সিদ্দিকী, পিপি রিজওয়ান শাহিদী, পিপি এমদাদুল আজিজ চৌধুরীসহ রোটারি ডিস্ট্রিক্টের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রোটারি ক্লাবের বর্তমান ও সাবেক সভাপতি, ক্লাব সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।
আয়োজকরা জানান, কর্মসূচির উদ্দেশ্য পোলিও নির্মূলে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং এ বৈশ্বিক উদ্যোগে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা। র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা পোলিওমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালের ‘এন্ড পোলিও নাও’ (End Polio Now) কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও মানবিক সেবার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।

