রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার

০১ জানুয়ারি ২০২৬

৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

Logo

ক্ষতবিক্ষত বুকে স্বপ্নের আলো—স্বাগতম ২০২৬

চট্টগ্রাম জার্নাল ডেস্ক: রক্তিম ভোরে নতুন বছরের সূর্য উঠলেও পেছনে পড়ে থাকল প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ আর গভীর শোকের এক উত্তাল অধ্যায়। তবু সেই ক্ষত বুকে নিয়েই ২০২৬ সালে নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ।

পূর্ব আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে উঠেছে ২০২৬ সালের প্রথম সূর্য। পেছনে পড়ে রইল ভাঙা-গড়ার এক দীর্ঘ ও উত্তাল সময়। জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের মানুষ আজ আরেকটি নতুন বছরে পা রাখছে, যা কেবল সময়ের আবর্তন নয়—বরং দু’চোখ ভরা স্বপ্ন আর দৃঢ় প্রত্যয়ের নতুন যাত্রা।

২০২৫ সাল ছিল প্রতিরোধের, শোকের এবং মাথা নত না করার এক অমর উপাখ্যান। বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তে এসে শোকাতুর পরিবেশ গ্রাস করে পুরো দেশকে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে কেঁদেছে কোটি মানুষ। বিদায়বেলার সেই অশ্রুসিক্ত ভালোবাসাই প্রমাণ করে, মানুষের হৃদয়ে তিনি কত গভীর শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

এই শোকের আবহ আরও ঘনীভূত হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার ঘটনায়। ঘটনাটি স্তব্ধ করে দেয় আরেকটি নীরব সত্য—এই দেশের মানুষ আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর অন্যায়ের ছায়ায় মাথা নত করতে রাজি নয়।

তবুও শোকের গভীরতা ছাপিয়ে জাতি আজ বুক বাঁধছে এক অদম্য গর্বে। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি; শহীদদের রক্ত আজ নতুন যুগের শিকড়ে প্রাণ সঞ্চার করেছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েও বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক মহাবিপ্লবের দোরগোড়ায়। এই মাটি আজ ধারণ করছে পুনর্জাগরণের নতুন অঙ্গীকার।

সব ভাঙন আর দুর্বলতার মধ্যেও ২০২৫ কোনো আত্মসমর্পণের বছর ছিল না; এটি ছিল জাগরণের বছর। তবে রূপান্তরের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। এই পরিবর্তনের মূল্য দিতে গিয়ে শূন্য হয়েছে বহু মায়ের কোল, প্রিয়জন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য ঘর। কিছুকাল থমকে গিয়েছিল স্বপ্ন, স্থবির হয়েছিল জীবিকার চাকা। শরীরের দৃশ্যমান ক্ষত আর মনের গহীনে জমে থাকা অদৃশ্য দাগ আজ জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই ক্ষতগুলো হয়তো কখনো পুরোপুরি মুছে যাবে না, তবে সেগুলোই হয়ে থাকবে সাহসিকতার পদক। পুরোনো, ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রতিটি ফাটল আজ হয়ে উঠছে নতুন সৃষ্টির উর্বর ভূমি। যেখানে ছিল দুর্নীতির রাজত্ব, সেখানে রোপিত হচ্ছে ন্যায়বিচারের চারা; যেখানে ছিল হতাশা, সেখানে ডানা মেলছে সম্ভাবনা; আর বিভেদের বিষবাষ্প সরিয়ে জন্ম নিচ্ছে এক অভূতপূর্ব ঐক্য।

দেশ গড়ার এই বিশাল দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়। এ দেশের মানুষ আজ নিজের ভাগ্যের চাবিকাঠি নিজের হাতেই তুলে নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ—এই গণজাগরণের প্রাণস্পন্দন—আজ আগামীর আধুনিক বাংলাদেশের প্রধান কারিগর হয়ে উঠছে। বিশৃঙ্খল ও কণ্টকাকীর্ণ হলেও ২০২৫ ছিল এই জাতীয় মহাকাব্যের এক অপরিহার্য অধ্যায়।

২০২৬ সালের ভোরের আলো তাই কেবল একটি নতুন সকাল নয়, বরং দীর্ঘ বিরহের পর এক মমতাময়ী সন্ধির মতো। যে রাজপথগুলো একসময় মিছিল আর উত্তেজনায় প্রকম্পিত হতো, সেখানে এখন পড়বে স্বপ্নদ্রষ্টা ও নির্মাতাদের শান্ত কিন্তু দৃঢ় পদচারণা।

এই বছর কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর নাম নয়—এটি একটি জাতির পুনর্জন্ম। উত্তাল সময়ের শিক্ষা সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন আর শুধু টিকে থাকতে চায় না; অদম্য সাহসে শ্রেষ্ঠত্বের পথে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্পই ২০২৬-এর মূল সুর।

নতুন বাংলাদেশের হয়তো অপূর্ণতা আছে, কারণ কোনো রাষ্ট্রই নিখুঁত নয়। তবে এই বাংলাদেশ এখন সাহস নিয়ে স্বপ্ন দেখতে জানে, অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে জানে এবং নিরলস পরিশ্রমে নতুন কিছু গড়তে জানে। ২০২৫ সালের প্রতিটি বিসর্জন আজ রূপ নিচ্ছে ন্যায়বিচার, সাম্য ও সমৃদ্ধির ভিত্তিপ্রস্তরে।

২০২৬ সালের ভোর তাই শুধু সূচনা নয়—এটি এক পুনর্জন্মের ঘোষণা। সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়—আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিহাসের অন্যতম অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সূচিত হতে যাচ্ছে নতুন বাংলাদেশের আরেকটি অধ্যায়।

বাংলাদেশ আজ প্রাণশক্তি, প্রত্যয় আর আশার অবিনশ্বর শক্তির এক জীবন্ত দলিল।