মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মঙ্গলবার

০৪ আগস্ট ২০২৬

৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১১ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

Logo

মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিন: বীর গেরিলা ফজল আহমদের স্মৃতিচারণ

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়, এটি আত্মত্যাগ, সাহস ও সংগ্রামের এক অনন্য মহাকাব্য। সেই ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও সম্মুখযোদ্ধা বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের নানা পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার স্মৃতিচারণ আজও ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার গৈড়লা গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া ফজল আহমদ ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে পটিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার টালবাহানায় উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো দেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনে সংগঠক হিসেবে কাজ করেন ফজল আহমদ। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর চট্টগ্রামেও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি। পরে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিতে গোপনে ভারতে যান এবং আসামের তেজপুর সেনানিবাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন। করলডেঙ্গা পাহাড়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্থানীয় যুবকদেরও প্রশিক্ষণ দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধলঘাট স্টেশন দখল, ইন্দ্রপুল ধ্বংস, গৈড়লার টেকে সম্মুখযুদ্ধ, পটিয়া থানায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশ নেন তিনি।

স্বাধীনতার পরও দেশগঠনের কাজে সক্রিয় ছিলেন ফজল আহমদ। ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে চট্টগ্রাম কাস্টমস এবং ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দিয়ে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে যুগ্ম পরিচালক পদ থেকে অবসর নেন।

অবসরের পরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, চট্টগ্রাম বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন।

ফজল আহমদের ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাধীনতার চেতনা লালন করাই আজকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।