শুক্রবার
০৯ অক্টোবর ২০২৬
২৫শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৯শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি


নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর সমন্বিত বাস্তবায়ন, খালের দুই পাড়ে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত সমন্বয় ও পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নের বদলে স্থায়ী সমাধানের জন্য সামষ্টিক পরিকল্পনা নিতে হবে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম ও জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
“সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত ফল মেলে না”
মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অন্য এলাকায় নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। সভায় বাস্তবায়িত কাজের পর্যালোচনা এবং বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খালপাড়ে হাঁটার পথ, সাইকেল ট্র্যাক
মন্ত্রী বলেন, বড় খালগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি দুই পাড়ে হাঁটার উপযোগী পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে সুযোগ আছে, সেখানে সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণও চলমান ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। খালকেন্দ্রিক উন্নয়নকে শুধু পানি নিষ্কাশনে সীমাবদ্ধ না রেখে নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ার অংশ হিসেবে দেখতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যেখানে সুযোগ আছে সেখানে গাছ লাগাতে হবে। এটি সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক হবে।
প্রতি মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনা
চসিক, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত সমন্বয় ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। এ লক্ষ্যে প্রতি মাসে অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে অর্থের অপচয় কমবে, কাজের গতি বাড়বে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমবে বলে তিনি মনে করেন।
মেয়র: ১৩০ খালের মধ্যে ৪১টির প্রকল্প প্রণয়ন চলছে
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নালা-খাল পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে। বর্ষার আগে নালা ও খাল উন্নয়ন ও পরিষ্কারের জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
মেয়র জানান, নগরীতে মোট ১৩০টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও ৪১টি খাল উন্নয়নে প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। উন্নয়নকাজ শেষ হওয়া খালগুলো চসিকের কাছে হস্তান্তরের পর প্রযুক্তিগত সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় ২ দশমিক ২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণ করা হয়েছে, যা তাঁর ভাষ্যমতে দেশের প্রথম। ভবিষ্যতে খালকেন্দ্রিক প্রকল্পের সঙ্গে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক যুক্ত করার পরিকল্পনাও আছে বলে জানান তিনি।
সংসদ সদস্যদের বক্তব্য
এরশাদ উল্লাহ বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার কিছু স্থানে ভারী বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার পেছনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা ও নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ড্রেনেজ, খাল ও পানি সংরক্ষণের স্থানগুলোকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আনা এবং নিষ্কাশনের পথের বাধা দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
আবু সুফিয়ান বলেন, সিডিএ, চসিক, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াসাকে নিজ নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, তাহলেই প্রকল্পগুলোর সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব।
সিডিএ: ১৩০ খালের ৩৭টি সংস্কার, আউটার রিং রোডের কাজ ডিসেম্বরে শেষের আশা
সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, ১৩০টি খালের মধ্যে ৩৭টি সংস্কার হয়েছে। প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে বাকি খালেও প্রয়োজনমতো সংস্কার করতে হবে। স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া এবং দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথাও বলেন তিনি।
আউটার রিং রোড প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, কালুরঘাট পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসক
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস বলেন, চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প প্রায় শেষের পথে। শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমবে। তবে প্রকল্পের বাইরের খালগুলোও খনন করতে হবে এবং সংস্কারের পর রক্ষণাবেক্ষণে জোর দিতে হবে।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপন করলেই হবে না, এগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে মানুষ ও যানবাহনের আশ্রয়ের জন্য উঁচু জায়গার সংকট দেখা গেছে। এ কারণে প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি, যা বন্যার সময় মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণ ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুযোগও রাখা যেতে পারে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ওয়াসা: ক্রস খাল, সুয়ারেজ প্রকল্প ও ১০০ কোটি লিটারের শোধনাগার
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম স্লুইসগেট ও রেগুলেটর পরিচালনা-রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে নগরীর দুপাশে অন্তত দুটি সংযোগকারী ‘ক্রস খাল’ নির্মাণের প্রস্তাবও দেন তিনি, যাতে মহেশখাল সম্প্রসারণও থাকবে। এতে নৌচলাচলের সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। খালের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করতে ভবিষ্যতে সেতু নির্মাণে আর্চ ব্রিজের নকশা বিবেচনার কথাও বলেন।
তিনি জানান, হালিশহরে সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ আগামী বছর শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে গৃহস্থালি বর্জ্যপানি সরাসরি ড্রেনে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা করেন তিনি। দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহ পরিকল্পনায় আগামী ১০০ বছরের চাহিদা বিবেচনা করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক এলাকার জন্য পিপিপির ভিত্তিতে দৈনিক ১০০ কোটি লিটার পানি শোধনের একটি প্রকল্প নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সভায় আরও বক্তব্য দেন সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মনোয়ারা বেগম, জলাবদ্ধতার মেগা প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিন, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া, চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, পানি উন্নয়ন বিভাগের প্রকল্প পরিচালক কর্নেল তারিকুল আলম, চসিকের খাল ও জলাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞ শাহরিয়ার খালেদ এবং সিটি রেড ক্রিসেন্টের সাধারণ সম্পাদক গোলাম বাকি মাসুদ। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।