বৃহস্পতিবার
০৫ নভেম্বর ২০২৬
২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি


চট্টগ্রাম জার্নাল ডেস্ক:: জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন। দলের রাজনৈতিক অবস্থান, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচন কৌশল এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগের বিষয়টি জানান সামান্তা শারমিন।
গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত এনসিপির নতুন কমিটিতে তাঁকে শুধু যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়েছিল। কমিটি ঘোষণার পর এটি তাঁর পদাবনতি কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়।
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন বলেন, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি আলাদা অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য নয় এবং দলটির সঙ্গে জোট করতে গেলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।
তিনি জানান, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব এবং আলোচনা করেছেন। দলের গৃহীত নীতিকে স্বীকৃত ফোরামে যুক্তিসংগতভাবে চ্যালেঞ্জ করে দলকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।
তবে তাঁর দাবি, এনসিপির পক্ষে দলের প্রারম্ভিক মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন না। এ কারণে প্রায় এক বছরের অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক সংগ্রামের ইতি টেনে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপির রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। এ জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইন সংস্কার এবং রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
তাঁর অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ মনে করে না। জামায়াতের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
সামান্তার মতে, জামায়াতকে সংস্কারের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করায় সাধারণ মানুষের একটি অংশ এনসিপির সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না থাকায় বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচন কৌশল নিয়েও সমালোচনা
২০২৬ সালের নির্বাচনকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপির সামনে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মোকাবিলা করে নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করার সুযোগ ছিল।
তাঁর মতে, বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে এককভাবে বা সংস্কারপন্থী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট করে এগিয়ে গেলে এনসিপি আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারত।
তিনি বলেন, নির্বাচনি জয়কে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন
বিবৃতিতে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে সামান্তা শারমিন বলেন, আন্দোলনে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধকারী ও রক্ষাকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তবে বিজয়ের পর নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর দাবি, এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও দলটি সেই পথ বেছে নেয়নি। নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় নারীদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা হয়নি।
সামান্তা শারমিন বলেন, নারীদের শুধু দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের কার্যকর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে বৈষম্যবিরোধী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, যে রাজনৈতিক শক্তি আন্দোলনের সময় নারীদের সাহস ও ত্যাগকে প্রয়োজনীয় মনে করে, অথচ বিজয়ের পর তাঁদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, সে শক্তি প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী হতে পারে না।
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার দলগুলো নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক না হয়ে বরং বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এনসিপির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য ও আলোচনার বিষয়গুলো দলের সদস্য এবং শুভানুধ্যায়ীদের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা থেকেই তিনি পদত্যাগের বিস্তারিত কারণ প্রকাশ করেছেন।