শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

শুক্রবার

০৬ নভেম্বর ২০২৬

২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৬শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

Logo

টেকনাফের পাহাড়ে তিন ম-রদে-হ, ঘিরে রেখেছে যৌথবাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ে তিনজনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। মরদেহ উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে যৌথবাহিনী। মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ নিহত হওয়ার ঘটনার পর পাহাড়জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানা ঘিরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান অব্যাহত ছিল। অভিযানে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরাও অংশ নিচ্ছেন।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, অভিযান এখনো চলছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে পাহাড়ে সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে টেকনাফ-উখিয়ায় মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি।

একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন টেকনাফের সাধারণ ছাত্র-জনতা। পাহাড়কে অপরাধমুক্ত করতে যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নিহত সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখের মরদেহ হেলিকপ্টারে করে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার আসরের নামাজের পর রামু সেনানিবাসে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারটি গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। সন্ধ্যার আগেই মরদেহটি সেখানে পৌঁছায়।

এর আগে শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে তাঁর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় রামু সেনানিবাসে।

গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের গহিন পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর গোলাগুলিতে সেনাসদস্য তিতাস শেখ নিহত হন। তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে।

শুক্রবার দুপুরে টেকনাফের পাহাড়ে যৌথবাহিনীর অভিযানে মানবপাচারকারীদের আস্তানা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের টেকনাফ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই ঘটনায় অস্ত্রসহ আটক ছয় মানবপাচারকারীকেও পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।

ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আদালতের মাধ্যমে তাঁদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নেওয়া হবে। সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায়ও আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি জানান, আগের দিন ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হলেও পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের মধ্যে একজনকে দালাল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এ কারণে প্রকৃত জিম্মির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ জনে।

উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানান, মানবপাচারকারীরা তাঁকে আট দিন ধরে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখেছিল। এ সময় দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।

তিনি জানান, কক্সবাজারের একটি সেতুতে কাজ করার সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়।

একপর্যায়ে মোবাইল ফোনসহ তাঁর সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নিয়ে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তাঁর মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাঁকেও আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তাঁদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।

পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর জানান, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাঁদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, পাঁচ দিন ধরে সেখানে অবস্থানকালে প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষকে এনে জড়ো করতে দেখেছেন। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় তাঁরাও নির্যাতনের শিকার হন। পরে তাঁদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

তাঁরা আরও জানান, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। গত বৃহস্পতিবার তাঁদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।

হ্নীলার স্থানীয় বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। তা না হলে মানবপাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়।

পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত।

এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।