সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬
২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৭শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি


আন্তর্জাতিক ডেস্ক: কর্মদিবস শেষে আনন্দ–উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে যে সপ্তাহান্ত শুরু হয় দুবাইয়ে, শনিবার সকালেও ছিল তেমনই চিত্র। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাম জুমেইরাহর সৈকতসংলগ্ন ক্লাবগুলো ভরে ওঠে। সমুদ্রতীরে দৌড়বিদদের দল, বিপণিবিতানে ক্রেতাদের ভিড়—সব মিলিয়ে শহরটি ছিল স্বাভাবিক ছন্দে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ছবিতে নীল আকাশ, শান্ত সমুদ্র আর ব্যস্ত নগরজীবনের চেনা দৃশ্যই দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এর আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত তীব্র আকার নিচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে অঞ্চলটির বিভিন্ন আকাশপথ বন্ধ হয়ে যায়। তবুও দুবাই সতর্কতার সঙ্গে স্বাভাবিকতা ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বহু বছর ধরে অস্থির অঞ্চলে স্থিতিশীল ও নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে এ শহর।
তবে সূর্যাস্তের পরই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। সন্ধ্যার কিছু পর পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসতে শুরু করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও বাহরাইনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাতের আকাশে উড়তে দেখা যায় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ‘ইন্টারসেপ্টর’।
অনেক পর্যটক জানান, তাঁরা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কোথাও সাইরেন বাজেনি। স্থানীয় নম্বর ব্যবহারকারীরা সতর্কবার্তা পেলেও বিদেশিরা প্রথমে বুঝতে পারেননি কী ঘটছে।
পাম জুমেইরাহর পাঁচ তারকা রিসোর্ট ফেয়ারমন্ট দ্য পাম-এর কাছে অবস্থানরত পর্যটক নাতালিয়া ভেরেমেনকো বলেন, “প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম আতশবাজি ফুটছে।” ড্রোন হামলায় রিসোর্টটির প্রবেশদ্বারে আগুন ধরে যায়।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুবাই মল এলাকার পরিবেশও বদলে যায়। আলোকসজ্জা দেখতে জড়ো হওয়া পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দুবাই ও আবুধাবি বিমানবন্দরে আগুনের খবর পাওয়া যায়। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ঘন ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলায় ১ জন নিহত ও অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। রোববার আরও দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
জেবেল আলী বন্দর এলাকা থেকেও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দরটির একটি বার্থে আগুন লাগে। এমনকি পালতোলা নৌকার আদলে নির্মিত দুবাইয়ের প্রতীকী স্থাপনা বুর্জ আল আরব-এও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগে।
হামলার লক্ষ্য ছিল সরাসরি পর্যটনকেন্দ্র নাকি মার্কিন সামরিক স্থাপনা—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ শহর হিসেবে দুবাইয়ের যে সুনাম ছিল, তাতে বড় ধাক্কা লেগেছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিলাসবহুল হোটেলগুলো অতিথিদের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ থেকে সরিয়ে ভূগর্ভস্থ পার্কিং ও সার্ভিস করিডরে নিয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফা-তে হামলা হয়েছে। পরে তা ভিত্তিহীন বলে জানা যায়।
সকাল হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় কর্তৃপক্ষ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে।
এক্সে দেওয়া পোস্টে বিশ্লেষক আমজাদ তাহা দাবি করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং জীবন ও ব্যবসা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে।
তবে রাতের সেই আতঙ্ক দুবাইয়ের বাসিন্দা ও পর্যটকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।