বুধবার
২২ এপ্রিল ২০২৬
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি


বিশেষ প্রতিনিধি:: গ্রীষ্মের শুরুতেই চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা। এতে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি, বিশেষ করে তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্করা বেশি কষ্টে পড়ছেন।
নগরীর এনায়েত বাজার এলাকায় মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। প্রতিবারই এক ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ ছিল না। ফিরিঙ্গীবাজার শিববাড়ি এলাকাতেও একই দিনে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়। বাসিন্দাদের অভিযোগ, কখনো এক ঘণ্টা, কখনো দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু শহরেই নয়, গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত লোডশেডিং তীব্র হয়ে ওঠে। দিন-রাত মিলিয়ে অনেক এলাকায় ৭-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও পড়েছেন বিপাকে।
পিডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে মোট ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকট এবং রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কারণে বেশিরভাগ কেন্দ্র অর্ধেক সক্ষমতায়ও উৎপাদন করতে পারছে না।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩০০ থেকে ১৪০০ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
পিডিবির তথ্যমতে, সোমবার অফপিক সময়ে উৎপাদন ছিল ২১৫২ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে ২৩৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে দিনে ৬৭ মেগাওয়াট এবং রাতে ১০৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।
গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যানেও একই চিত্র দেখা গেছে। রোববার রাতে চাহিদা ছিল ১৫৮৫ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া গেছে ১৪৫৮ মেগাওয়াট—অর্থাৎ ১২৭ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। শুক্রবার পিক সময়ে উৎপাদন ছিল ১৮৮৫ মেগাওয়াট, যা অফপিক সময়ে নেমে আসে ১৩৮০ মেগাওয়াটে।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, তেল ও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। রাউজান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রেও পানির স্বল্পতায় উৎপাদন কমে গেছে।
ফার্নেস অয়েল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় অর্ধেক উৎপাদন করছে। তবে মাতারবাড়ি ও বাঁশখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে।
পিডিবি চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী জানান, চট্টগ্রামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর সারা দেশে বণ্টন করা হয়। ফলে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হয় না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাহিদাও সমন্বয় করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস ও তেলের সংকট কাটিয়ে উঠলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে এবং লোডশেডিং কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাস্তবে ঘোষিত সময়ের চেয়েও বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। পটিয়া উপজেলার এক বাসিন্দা জানান, দিন-রাত মিলিয়ে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, উৎপাদন ঘাটতি, জ্বালানি সংকট ও জাতীয় গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দ্রুত সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।