শুক্রবার
০৭ আগস্ট ২০২৬
৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি


চট্টগ্রাম জার্নাল ডেস্ক:: টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শুধু নির্বাচন আয়োজন বা সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক চর্চা, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত “টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং তা অবশ্যই নিয়মভিত্তিক হতে হবে। এটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, একটি সংস্কৃতি — মানুষের চিন্তা, আচরণ ও রাজনৈতিক চর্চার প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকতে হবে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকেনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক চর্চার সূচনা করেছিলেন এবং পরে খালেদা জিয়াও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন, তবে বিভিন্ন সময়ে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, দলটি গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারকে ব্যর্থ ঘোষণা করা বা পদত্যাগের দাবি তোলা গণতান্ত্রিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান সংসদ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাস্তায় নেমে চাপ সৃষ্টি বা ‘মব’ তৈরির সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সহনশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। নিজের মতের সঙ্গে মিল না থাকলেও অন্যের মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা বেড়ে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরতে হবে। তবে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো ও আর্থিক বাস্তবতা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পথে বড় বাধা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্যে, অনেক মালিক ব্যবসায়িক বা আর্থিক কারণে সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে সংকোচ তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি চাপ না থাকলেও অনেক সংবাদকর্মী আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটেন। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্য প্রকাশে সাহসী হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদমাধ্যমে কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, অনেক সাংবাদিককে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম বেতন ও চাকরির নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিক ও মালিকদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বর্তমানে একটি ছোট ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করছে উল্লেখ করে বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার একটি কঠিন রূপান্তরকালীন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়; জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি সরকার, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং সমাজের সব অংশকে আরও ধৈর্যশীল ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান। শক্তিশালী গণমাধ্যম ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।