শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার

২৫ আগস্ট ২০২৬

৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৩ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

Logo

সার সংকটে ক্ষোভ বাড়ছে মাঠে মাঠে, প্রশ্নের মুখে সরকারি ব্যবস্থাপনা

বিশেষ প্রতিনিধি:: আমন ধান ও শীতকালীন বিভিন্ন ফসলের মৌসুম সামনে রেখে দেশে সারের চাহিদা যখন বাড়ছে, তখন বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকার নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনমতো সার না পেয়ে অনেক কৃষককে খোলা বাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

গণমাধ্যমের পক্ষ হতে অন্তত দেশের ১০টি জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা হলে তারা সারের সংকট ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ করেছেন। কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত অনেক ডিলার পয়েন্টে সার নেই বলে জানানো হচ্ছে অথবা চাহিদার তুলনায় খুব কম পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের।

কৃষকদের ভোগান্তির চিত্র

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ বাবলুর ১৬ বিঘা আমন ধানের জমির জন্য প্রয়োজন ১০ বস্তা সার।

স্থানীয় ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে পাশের কোচানপুর উপজেলার একটি বাজারে যান তিনি। সেখানে মাত্র ২০ কেজি সার কেনার সুযোগ পান।

শেষ পর্যন্ত সার না কিনেই বাড়ি ফিরতে হয় তাকে, পরে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে বাধ্য হন তিনি। সরকারি নির্ধারিত ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা দামের বস্তা সেখানে বিক্রি হচ্ছিল ১ হাজার ৬৫০ থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকায়।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক লতিফ উদ্দিনের ১০ বিঘা আমন জমির জন্য প্রয়োজন পাঁচ বস্তা সার। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে পেয়েছেন মাত্র এক বস্তা।

বাকি চার বস্তা খোলা বাজার থেকে কিনতে গিয়ে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৩৫০ টাকা দিতে হয়েছে তাকে। তার অভিযোগ, ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকদের সার না দিয়ে গোপনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার ৪০ বছর বয়সী কৃষক কবির হোসেন জানান, দুই দিন ধরে ডিলারদের কাছ থেকে সার সংগ্রহের চেষ্টা করেও পাননি তিনি। আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগ এবং আগাম শীতকালীন সবজির জন্য জমি প্রস্তুতের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলারদের মধ্যে সিন্ডিকেটের অভিযোগও করেন তিনি।

কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ ও রাজশাহীর কৃষকদের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, প্রায়ই ডিলাররা সার মজুত নেই বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক হারুন-অর-রশিদ বলেন, নিজের টাকা নিয়ে সার কিনতে এসেও পাচ্ছেন না তিনি। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে জমি চাষ করা কঠিন হয়ে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

‘মজুত পর্যাপ্ত’ বলছে মন্ত্রণালয়

তবে কৃষকদের অভিযোগের বিপরীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে সারের মজুত চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারের চাহিদা ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। বিপরীতে বর্তমানে মজুত রয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টন।

কৃষি সচিব মো. সেলিম খান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান মজুত বিবেচনায় সারের সংকট হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি জানান, সরকার নন-ইউরিয়া সারের আমদানি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মরক্কো, সৌদি আরব, তিউনিসিয়া, রাশিয়া ও কানাডা থেকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এসব সার দেশে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও বিতরণব্যবস্থায় তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলাকে ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের’ অংশ বলে অভিযোগ করেছেন।

জেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত। তাদের মতে, ভুট্টা ও আলু চাষের জন্য কিছু কৃষক আগাম সার কিনে রাখছেন। আবার কোথাও কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করার কারণেও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের মানসুরনগর ইউনিয়নের সার ডিলার জামিল আহমেদ বলেন, সার সংকট হতে পারে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চরাঞ্চলের কৃষকেরা ভুট্টা চাষের জন্য আগেভাগেই সার কিনে রাখছেন।

ঝিনাইদহের সাধুহাটি ইউনিয়নের একটি ডিলার পয়েন্টের ব্যবস্থাপক ওমর আলী রাসেল বলেন, বরাদ্দ অনুযায়ী যে পরিমাণ সার তারা পাচ্ছেন, কৃষকদের মধ্যে সেটিই বিতরণ করছেন এবং কোনো অনিয়ম হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

ক্ষুব্ধ কৃষকদের গুদামে হানা

তবে সরকারি আশ্বাসেও কৃষকদের অসন্তোষ কমেনি। গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ক্ষুব্ধ কৃষকেরা একটি ডিলারের গুদামে ঢুকে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান। সবশেষ খবর অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ১০০ বস্তা সার (প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি) উদ্ধার করা হয়েছে।

‘সংকটের পেছনে ডিলাররা’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক আবু সালেহ মো. শামীম আলম শিবলী বলেন, দেশে মজুত ও চাহিদার পার্থক্য খুব বেশি নয়। ফলে এই সামান্য উদ্বৃত্ত দিয়ে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তার মতে, সরকারের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে কিছু ডিলার পরিস্থিতির অপব্যবহার করছেন।

তিনি বলেন, একই ব্যক্তির ভিন্ন নামে একাধিক সার ডিলারের লাইসেন্স নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। আবার কিছু জেলায় অল্প কয়েকজন ডিলারের হাতে বড় অংশের বরাদ্দ থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে কার্যত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে।

ডিলারদের কার্যকর তথ্যভান্ডার না থাকায় একই ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করাও কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম বলেন, বছরের এই সময়ে বর্তমান পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। সাধারণত বোরো মৌসুমের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে কৃষকদের কিছুটা সমস্যা হলেও এখনকার পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন বলে জানান তিনি।

বর্তমান সংকটের জন্য কারা দায়ী—এমন প্রশ্নের জবাবে ইমাম বলেন, তার সন্দেহের তালিকায় একদল ডিলার রয়েছেন, যারা সংকট তৈরি করছেন।

তিনি জানান, মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। সাম্প্রতিক সংকটের ঘটনায় পাঁচটি ডিলারশিপ লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রায় ২৫ জন ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে।

সমস্যা সরবরাহে নয়, ব্যবস্থাপনায়

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, বর্তমান সমস্যাটি মূলত সারের সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে বিতরণব্যবস্থার সমস্যা। তিনি বলেন, সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও নিতে হবে।

বাংলাদেশের সার বাজার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপরও অনেকটা নির্ভরশীল। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত এবং চীনের সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধের মতো বৈশ্বিক পরিস্থিতি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ৫৮ লাখ টন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে দেশে সার উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম। দেশের সাতটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব কারখানা উৎপাদন করেছে মাত্র ১১ লাখ ৬ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ।

এদিকে মজুত সন্তোষজনক রাখতে সরকারও আমদানির উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। গত সপ্তাহে কানাডা, রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়ার পর গতকাল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আরও ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে।