রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

রবিবার

২৫ অক্টোবর ২০২৬

৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

Logo

চট্টগ্রামে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা আজ, সন্ধ্যায় ওড়বে বর্ণিল ফানুস

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধবিহারগুলোতে ভিড় করেছেন নানা বয়সি পুণ্যার্থী।

রবিবার (২৫ অক্টোবর) সকাল থেকে নগরের নন্দনকাননসহ বিভিন্ন বিহারে চলছে পূজা, প্রদীপ প্রজ্বালন ও প্রার্থনা। দিনভর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় বর্ণিল ফানুস ওড়ানোর অপেক্ষায় রয়েছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা।

ফানুসের আলোয় রাতের আকাশ আলোকিত করার পাশাপাশি বুদ্ধের অহিংসা, শান্তি ও মৈত্রীর বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন আয়োজকেরা।

নগরের শতবর্ষী নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারসহ বিভিন্ন বিহারে ভোর থেকেই উৎসবে মেতে ওঠেন ভক্তরা। নগর ও আশপাশের অঞ্চল থেকে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সি মানুষ উৎসবে যোগ দিয়েছেন।

সকালে নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই নতুন পোশাকে বিহার প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন পুণ্যার্থীরা। তাঁদের হাতে ছিল প্রদীপের থালা, গাদা ও পদ্মফুল এবং হরেক রকমের ফলমূল।

বুদ্ধমূর্তি ও বোধিবৃক্ষের চরণতলে ফুল নিবেদন ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পরে ভিক্ষুদের কাছ থেকে পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করেন ভক্তরা। দিনব্যাপী বিহারের বিভিন্ন কক্ষে চলবে বিশেষ ধর্মোপদেশ বা দেশনা এবং বিশ্বশান্তি কামনায় যৌথ প্রার্থনা।

বিহারে আসা পুণ্যার্থী তৃপ্তি বড়ুয়া বলেন, “প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি ও নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ারও দিন। প্রতিবছর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিহারে আসি। প্রার্থনা করি, পৃথিবী থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হোক, সবার জীবন শান্তিময় হোক।”

সন্ধ্যা নামার সঙ্গেই শুরু হতে যাচ্ছে প্রবারণা পূর্ণিমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব। নন্দনকানন বৌদ্ধবিহার ও আশপাশের এলাকায় এখন ফানুস ওড়ানোর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। প্রথাগত ফানুসের বাইরেও হাতি, ময়ূর, মাছ, বালিশ কিংবা মটকা আকৃতির নানা কারুকার্যময় ফানুস তৈরি করেছেন বিভিন্ন ধর্মীয় ও তরুণ সংগঠনের সদস্যরা। এসব ফানুসের গায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বুদ্ধের অহিংস বাণী, ছবি এবং মানবকল্যাণের বার্তা।

আয়োজকেরা জানান, একটি দিনের এই আয়োজনের প্রস্তুতি চলে কয়েক মাস ধরে। ফানুস তৈরি, বাঁশের কাঠামো বানানো, কাগজ লাগানো, রং করা ও মোম প্রস্তুত, প্রতিটি কাজেই যুক্ত থাকেন সংগঠনের সদস্যরা।

এবার ৩০টির বেশি ফানুস তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন আকৃতির আরও ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের কেউ কেউ প্রায় ৭০টি সংগঠনের অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন।

একজন আয়োজক বলেন, “আমরা শুধু ফানুস ওড়াই না, এর মাধ্যমে সবার কল্যাণ কামনা করি। প্রতিটি ফানুসের মধ্য দিয়ে বুদ্ধের অহিংসা, শান্তি ও মৈত্রীর বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই মিলে এ উৎসব উদ্‌যাপন করি।”

তিন মাসের বর্ষাবাস পালন শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আত্মশুদ্ধি, সংযম ও পারস্পরিক ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে প্রবারণা পূর্ণিমা উদ্‌যাপন করেন। অতীতের সব ভুল স্বীকার করে অন্যের কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করাই এর মূল দর্শন।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রবারণার সন্ধ্যায় ওড়ানো ফানুস গগনে থাকা বুদ্ধের ‘কেশধাতু চেতিয়’ বা স্মারক চিহ্নের উদ্দেশ্যে ভক্তদের শ্রদ্ধা হিসেবে পৌঁছে যায়।

বৌদ্ধবিহার সূত্রে জানা যায়, প্রবারণা উপলক্ষে পুণ্যার্থীরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করে জীবহত্যা, চুরি, মিথ্যাচারসহ অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার শপথ নেন।

পাশাপাশি সংঘদান, বুদ্ধপূজা ও পিণ্ডদানের মতো ধর্মীয় আয়োজনও থাকে। হিংসা, বিদ্বেষ ও সংঘাতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশান্তির প্রত্যাশাও এ উৎসবের অন্যতম বার্তা।

নন্দনকানন ছাড়াও নগরের ঐতিহাসিক কাতালগঞ্জ নবপণ্ডিত বিহার, পাথরঘাটা জেতবন শান্তিকুঞ্জ বিহার, চান্দগাঁও সার্বজনীন বৌদ্ধবিহার ও মোগলটুলী শাক্যমুণি বৌদ্ধবিহারে যথারীতি পালিত হচ্ছে প্রবারণার উৎসব।

চেরাগী পাহাড় ও মোমিন রোড এলাকায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম সামলাতে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাদাপোশাকের পুলিশসহ অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল কবির বলেন, “প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে ফানুস উৎসবে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। এ কারণে নিরাপত্তা ও নজরদারির ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হয়নি।

সাদাপোশাকের পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সব সময় সতর্ক রয়েছে। তাই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা দেখছি না।”