মঙ্গলবার
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি


ভবিষ্যতে পড়াশোনা আর ধুমধাম করে বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার রঙিন প্রতিশ্রুতিতে ১১ বছরের শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয়েছিল এক ‘অভিজাত’ পরিবারের হাতে। অভাবের তাড়নায় মা ভেবেছিলেন, হোটেল কর্মচারীর সামান্য আয়ে যা অসম্ভব, বিমানের বড় কর্মকর্তার ঘরে হয়তো সেই সুযোগ পাবে তার একমাত্র মেয়ে। কিন্তু সেই রঙিন আশ্বাস দ্রুতই পরিণত হলো এক দুঃস্বপ্নে। দীর্ঘ ৭ মাস নরক যন্ত্রণার পর, গুরুতর জখম নিয়ে এখন হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছে শিশুটি।
মিরসরাই—জায়গা বিরোধে তিন বছরের শিশুহত্যার অভিযোগ
ঘটনাটি ঘটেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমানের ঘরে। শিশু নির্যাতনের অভিযোগে স্ত্রীসহ তিনি এখন কারাগারে। সঙ্গে আছেন আর দুই গৃহকর্মী। বিমানের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার বাসায় এমন পাশবিক ঘটনা এখন সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
মামলার নথি ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুন মাসে উত্তরা পশ্চিম থানার এক নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. মো. সাফিকুর রহমানের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে যোগ দেয় শিশুটি। ভুক্তভোগীর মা ছিলেন অভাবী, আর আসামিরা দিয়েছিলেন মেয়ের যাবতীয় দায়িত্ব নেওয়ার বড় আশ্বাস।
কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। মা দেখা করতে চাইলেও নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। সর্বশেষ ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফোন আসে, ‘আপনার মেয়ে অসুস্থ, দ্রুত এসে নিয়ে যান।’
গরম খুন্তির ছ্যাঁকা ও রুদ্ধশ্বাস ৭ মাস
মামলায় বলা হয়েছে, গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় শিশুটিকে যখন তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তখন মা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। শিশুটির দুই হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগদগে ক্ষত। যন্ত্রণায় কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়েছে সে। দ্রুত তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শিশুটি জানায় সেই লোমহর্ষক বর্ণনা। গত বছরের ২ নভেম্বর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে তাকে অমানুষিক মারধর করা হতো। তুচ্ছ অজুহাতে খুন্তি আগুনে গরম করে তার কোমল শরীরে দেওয়া হতো ছ্যাঁকা। প্রধান দুই আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা নিয়মিত এই নির্যাতনে অংশ নিতেন।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিমানের এমডি ড. মো. সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বিথী এবং দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে গ্রেফতার করে।
পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদের আদালতে আসামিদের হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘পেটের দায়ে মা শিশুকে কাজে দিয়েছিলেন, কিন্তু ১১ বছরের শিশুটির ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে তা ক্ষমার অযোগ্য।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী জাকির হোসেন সাফিকুর রহমানের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন এবং তার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জামিন প্রার্থনা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন এবং তাদের পরিচয় নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের জেলহাজতে আটক রাখা প্রয়োজন।
তবে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামিদের জামিন আবেদন নাকচ করে চারজনকেই জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।