সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অশালীন কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
তবে পরিবার কিংবা দূতাবাসকে না জানিয়ে শাস্তি কার্যকর করায় সৌদি আরব আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশন বা প্রটোকল লঙ্ঘন করেছে কি না—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ।
সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) তথ্য অনুযায়ী, পবিত্র মসজিদে অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ওই দুজনকে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনী। পরবর্তীতে আপিল প্রক্রিয়া শেষে গত বুধবার তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তবে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট নিশ্চিত করেছে, তাদের আটক, বিচার বা সাজা বাস্তবায়নের কোনো তথ্যই আগাম জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। এমনকি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা আদৌ বাংলাদেশি নাগরিক কি না, সেটিও দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি।
সংবাদ মাধ্যম থেকে খবরটি জানার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
ভিয়েনা প্রটোকল ও আন্তর্জাতিক আইনি বিশ্লেষণ
কূটনৈতিক আচরণবিষয়ক ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো দেশে বিদেশি নাগরিক আটক বা গ্রেপ্তার হলে বিলম্ব না করে তাঁর দেশের কনস্যুলেট বা দূতাবাসকে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে। ১৮০টিরও বেশি দেশের অনুসমর্থিত এই চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ সৌদি আরবও।
আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সৌদি আরব কনস্যুলার আইন ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল উপেক্ষা করেছে:
ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন: ব্র্যাকে অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান জানান, দূতাবাস বা পরিবারকে অন্ধকারে রেখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে সৌদি আরব সরাসরি ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। কনস্যুলার সুবিধা দেওয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও তা নিশ্চিত করা হয়নি।
কনস্যুলার সুবিধার নিশ্চয়তা: আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ জানান, আপিল প্রক্রিয়া চলাকালে আসামিদের বারবার জানাতে হয় যে তারা নিজ দেশের কনস্যুলার সুবিধা চান কি না। আসামি নিজে সুবিধা নিতে অস্বীকার করলে ভিন্ন কথা, কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে নোটিফাই করেছিল কি না তার প্রমাণ থাকতে হবে।
তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, কোনো দেশে বিদেশি নাগরিক অপরাধ করলে তা সেই দেশের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। আসামি নিজে কনস্যুলার সুবিধা না চাইলে আইনি প্রক্রিয়া জানানো দেশটির অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকতে পারে। তবে কোনো দেশ জানতে চাইলে তথ্য প্রদান করা শিষ্টাচারের অংশ।
মরদেহ ফেরা ও পরিবারের অনিশ্চয়তা
আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য না পাওয়ায় নিহতদের মরদেহ ফেরত আনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন এখনও জানে না মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে বা কবে হস্তান্তর করা হতে পারে।
দূতাবাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করতে না পারায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নিয়ম অনুযায়ী পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে দূতাবাস মরদেহ ফেরত আনার সহায়তায় হাত বাড়ায়, তবে সৌদি প্রশাসনের অসহযোগিতায় আপাতত থমকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।

