চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূরকে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) বদলি করা হয়েছে। কোতোয়ালী থানার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় তাঁকে বদলি করা হলো।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ডিএমপিতে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। বদলির বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছেন ওসি আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূরসহ পাঁচ পুলিশ পরিদর্শককে ডিএমপিতে বদলি করা হয়েছে। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁরা তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) হিসেবে গণ্য হবেন।
সিএমপিতে গত ১৮ জুনের রদবদলের অংশ হিসেবে আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূরকে কোতোয়ালী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে তিনি সিএমপির লাইনওয়ে পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাস তিন দিনের মাথায় তাঁকে ডিএমপিতে বদলি করা হলো। এর আগে কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ওসি নাজমুন নূরকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে আসে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে পটিয়া থানার ওসি থাকাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীরা তাঁর অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করেন। এ সময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কও কয়েক ঘণ্টা অবরোধ করা হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, পটিয়া থানায় এক ছাত্রলীগ কর্মীকে নিয়ে উত্তেজনার সময় পুলিশ তাঁদের ওপর লাঠিপেটা করে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আন্দোলনকারীরা ওই ব্যক্তিকে মারধর করতে করতে থানায় নিয়ে গিয়ে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সে সময় ওসি নাজমুন নূর জানিয়েছিলেন। এর পরদিন রাতেই তাঁকে পটিয়া থানার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এর আগে সন্দ্বীপ ও টেকনাফ থানাতেও দায়িত্ব পালন করেন নাজমুন নূর। টেকনাফ থানার ওসি থাকাকালে একটি হত্যা মামলার এজাহার পরিবর্তনের অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওই হত্যা মামলার বাদী অভিযোগ করেন, তাঁর দেওয়া এজাহার পরিবর্তন করে পুলিশ আদালতে ভিন্ন এজাহার পাঠিয়েছে। অভিযোগে ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর ও তৎকালীন ওসি (তদন্ত) হিমেল রায়ের নাম উল্লেখ করা হয়।
বাদীর দাবি, তাঁকে থানায় ডেকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের উপস্থিতিতে চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নতুন এজাহারে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে আদালতে পাঠানো এজাহার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য এবং একজন প্রধান আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ওসি নাজমুন নূর তখন বলেছিলেন, আদালতে কে কী অভিযোগ করেছেন, তা তাঁর জানা নেই। এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন না।
২০২২ সালে পতেঙ্গা থানার ওসি থাকাকালেও তাঁর বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীকে মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আটক এক ব্যক্তিকে পুলিশের গাড়িতে তুলে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একই ঘটনায় মামলা নিতে গড়িমসি এবং এজাহারে কাটছাঁটের অভিযোগও করেছিলেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।
তবে অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন তৎকালীন ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর। তাঁর দাবি ছিল, পুলিশ কাউকে মাঝপথে ছেড়ে দেয়নি। মামলা নিতে দেরি হওয়ার বিষয়ে তিনি প্রাথমিক তদন্তের পর মামলা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূরকে পটিয়া থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর টেকনাফ ও সন্দ্বীপ থানায় দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৬ সালের জুনে তিনি চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
সর্বশেষ ১৮ সেপ্টেম্বর কাজীর দেউড়ি থেকে লালখান বাজার এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করেন। ওই সময় কোতোয়ালী থানার ওসি নাজমুন নূর নগরের দ্যা কিং অব চিটাগং ক্লাবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে আতিথেয়তা করছিলেন—এমন একটি বিষয় নিয়েও সিএমপিতে সমালোচনা হয়। তবে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে কোতোয়ালী থানায় দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় তিন মাসের মাথায় এবার ডিএমপিতে বদলি হলেন আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর।
পুলিশ সদর দপ্তরের একই প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ছাড়াও আরও চার পুলিশ পরিদর্শককে ডিএমপিতে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে গাজীপুর, এসবি, পিবিআই ও ফরিদপুর জেলা পুলিশের একজন করে কর্মকর্তা রয়েছেন।

