রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন। গাম্বিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ আটটি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজেদের ঘরে ফিরে যাক। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
তার পাঁচ প্রস্তাবের প্রথমটিতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।
পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে যেতে হবে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এই বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটাতে হবে।
‘মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল’
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও বঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ২০১৭ সালের সহিংসতার পর সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব বহন করছে।
বাংলাদেশে এখন ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি প্রজন্ম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে শুধু রোহিঙ্গারা নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে মানবপাচার, মাদকপাচার ও অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
‘মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে’
রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক সহায়তা কমে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের বহন করার প্রত্যাশাও করা যায় না।
‘সংকটের সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে’
রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প না হয়; বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে ওঠে।
বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমান, জাতিসংঘ মহাসচিবের রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বি এস জালো বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম ছালিহ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বৈঠক পরিচালনা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।

