মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

৮৭ টাকার মাল্টায় ১০৭ টাকা কর, কেজিতে দাম ৪০০ ছুঁই ছুঁই

বিশেষ প্রতিনিধি:

দেশে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির চেয়েও তাজা ফল মাল্টা আমদানিতে বেশি শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি টেসলা কিংবা হাইব্রিড মার্সিডিজ-বেঞ্জ আমদানির তুলনায় মাল্টার ওপর আরোপিত করভার বেশি হওয়ায় বাজারে ফলটির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

- Advertisement -

তথ্য অনুযায়ী, ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের একটি টেসলা গাড়ি আমদানিতে সর্বোচ্চ শুল্ক-করভার পড়ে ৮০ শতাংশ। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি বিওয়াইডির ক্ষেত্রে তা ৬৪ শতাংশ। আর মার্সিডিজ-বেঞ্জের প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িতে শুল্ক-করভার ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

অন্যদিকে, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত সাধারণ ফল মাল্টা আমদানিতে শুল্ক-করভার দাঁড়িয়েছে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ট্যারিফ অনুযায়ী, অন্তত ১৪৬টি এইচএস কোডভুক্ত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-করের হার মাল্টার চেয়ে কম।

৮৭ টাকার মাল্টায় করই ১০৭ টাকা

উচ্চ শুল্কের প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। সম্প্রতি বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে দাম কিছুটা কমে প্রায় ৪০০ টাকা হলেও তা এখনো সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে।

আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাম প্রায় ৮৭ টাকা। অথচ এই ৮৭ টাকার মাল্টার ওপরই শুল্ক-কর দিতে হয় প্রায় ১০৭ টাকা। অর্থাৎ, পণ্যের মূল্যের চেয়েও বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে শুল্ক-কর হিসেবে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, বিশ্বের অন্য কোনো দেশে ফল আমদানিতে এ ধরনের বিপুল শুল্ক-কর আরোপের নজির নেই।

ধাপে ধাপে বেড়েছে করভার

তথ্য বলছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে মাল্টা আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। তখন প্রতি কেজিতে শুল্ক-কর দিতে হতো প্রায় ১২ টাকা।

পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে করভার বাড়তে বাড়তে ২০২১-২২ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশে। এরপর ২০২২ সালের মে মাসে ডলার-সংকট মোকাবিলা এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করতে তৎকালীন সরকার ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করে।

পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা বাড়িয়ে মাল্টার ওপর বর্তমান শুল্ক-করভার দাঁড়িয়েছে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশে।

যুক্তরাষ্ট্রে ৫.১৯, ভারতে ৩৩ শতাংশ

বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের তুলনাতেও মাল্টায় শুল্কের বড় পার্থক্য দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে মাল্টার কার্যকর শুল্কহার মাত্র ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ২৩ গুণ কম। প্রতিবেশী ভারতে মাল্টা আমদানিতে কার্যকর শুল্কহার ৩৩ শতাংশ।

আমদানি কমলেও রাজস্ব বেড়েছে

উচ্চ শুল্কের কারণে দেশে মাল্টার আমদানি কমেছে। তবে একই সময়ে এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টা আমদানি থেকে রাজস্ব এসেছিল ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে মাল্টার আমদানি কমলেও এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

শুল্ক কমানোর সুপারিশ

তাজা ফলের ওপর শুল্ক-কর কমানোর জন্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আগেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়ে সুপারিশ করেছে।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ডলার-সংকট মোকাবিলায় সাময়িকভাবে ফলের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছিল। এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় মাল্টার শুল্ক-কর যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা উচিত।

তিনি বলেন, রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত একটি ফলের ওপর বিলাসবহুল গাড়ির চেয়েও বেশি শুল্ক আরোপ করা দেশের শুল্ককাঠামোর ভারসাম্যের ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও