বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ (অক্টোবর ২০২৬) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সংস্কারের রূপরেখা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ: প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫.৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মূল কারণ বিনিয়োগে মন্দা।
এ সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫ শতাংশ ও সরকারি বিনিয়োগ ০.৭ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি ৪.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
শিল্প খাত: তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে চলছে, কর্মঘণ্টা কমানো হয়েছে বা শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। ফলে গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০.৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা করোনা মহামারির পর প্রথম।
মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য: সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭ শতাংশে দাঁড়ালেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমেনি। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৬.৭ শতাংশ বাড়ায় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এক বছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে এবং গত অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার আনুমানিক ২২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
ব্যাংক খাত: অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে ব্যাংক খাত। ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে হার ৫৮.৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩.২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হারও ঋণাত্মক হয়ে গেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
সরকারি অর্থায়ন: রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রায় না পৌঁছানো এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভর করছে। প্রথম ১১ মাসেই সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১.৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, যা বেসরকারি খাতের ঋণের সুযোগ সংকুচিত করছে। সামাজিক সুরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও প্রকৃত দরিদ্ররা এর পুরোপুরি সুফল পাচ্ছে না, ফলে বৈষম্য বাড়ছে।
পূর্বাভাস ও পরামর্শ: আগামী দুই বছরও প্রবৃদ্ধি ৩.৪ থেকে ৩.৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংকট উত্তরণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি রোধ এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে রাজস্ব ও সুশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

