শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

সংবিধান লঙ্ঘন করেই চলেছে গুম-সংস্কৃতি, বললেন রাষ্ট্রপতি ফখরুল

চট্টগ্রাম জার্নাল ডেস্ক:

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, গুমের ঘটনায় জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

- Advertisement -

রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

নিখোঁজদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা

রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকারদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা লড়াই করা স্ত্রী কিংবা বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় শৈশব পার করা সন্তানের কথা তিনি স্মরণ করছেন।

গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ

রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, তার স্বজনদের হাসি, শান্তি ও স্বপ্নও কেড়ে নেয়। তিনি জানান, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিলেও গুম-খুনের মাধ্যমে এসব অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।

দেড় দশকের ‘আয়নাঘর’ বাস্তবতা

বিগত দেড় দশকে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন করলেই অনেককে তুলে নিয়ে গুম ও গোপনে হত্যা করা হয়েছে, যা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বীকার করে গেছে।

তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ গুমের শিকার অসংখ্য মানুষের কথা স্মরণ করেন। আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বহু ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল বলে দাবি করেন রাষ্ট্রপতি।

খালেদা জিয়ার স্মরণ

বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন এসবের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

তদন্ত কমিশনের তথ্য

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে গুম ও গোপনে হত্যার চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।

নতুন বিল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার

রাষ্ট্রপতি জানান, এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Victims first, Action now’। গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা বজায় রেখে এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।

পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব

রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না—গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

“আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না”

রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।” কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি ঘোষণা দেন, দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে।

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না।

তিনি বলেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়, বরং তা কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক—তা দিয়েই নির্ধারিত হয়। গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও