তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে অন্তত সাত জেলায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে দীর্ঘ লোডশেডিং জনঅসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া, রাতের বেলায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং এবং ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে।
চাহিদা ও উৎপাদনে বড় ব্যবধান
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
গত তিন সপ্তাহ ধরে গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ২টায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। রোববার রাত ৮টায় ১৭ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯৮৩ মেগাওয়াট।
মধ্যরাতে বাড়ছে লোডশেডিং
আগে মধ্যরাতের পর বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেলেও এখন চিত্র ভিন্ন। রাত ১০টার পর থেকেই লোডশেডিং বাড়ছে এবং মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং এবং গভীর রাতে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো এর অন্যতম কারণ।
সাত জেলায় বিক্ষোভ
লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, নেত্রকোনা, রাজশাহী, শেরপুর, সিলেট ও ঢাকার দোহারে বিক্ষোভ হয়েছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করা হয়। দোহারে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও সড়ক অবরোধ করেন গ্রাহকরা। সিলেটে মহাসড়ক অবরোধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম বন্ধ করে দেন বিক্ষুব্ধ লোকজন। রাজশাহী ও শেরপুরেও বিদ্যুৎ অফিস ঘিরে বিক্ষোভ ও কর্মকর্তাদের হুমকির ঘটনা ঘটে।
সংসদে বিদ্যুৎমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারে ত্রুটি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তিনি পরিস্থিতিকে সাময়িক জাতীয় সংকট উল্লেখ করে জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
সংকটের আরও কারণ
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তাপপ্রবাহের কারণে এসি ও ফ্যানের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে রয়েছে। পায়রা ও বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি কেন্দ্রে জ্বালানি সংগ্রহে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ক্রমবর্ধমান জনরোষের মুখে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা জোরদারের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে কাজ করছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই মুহূর্তে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হলে তাপমাত্রা কমার পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদাও কমে আসবে, যা সংকট কিছুটা লাঘব করতে পারে।

