শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর: থামেনি স্বজনদের কান্না, অপূর্ণ রয়ে গেছে প্রতিশ্রুতির হিসাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ দিনগুলোর একটি ১১ জুলাই। ২০১১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শেষে বাড়ি ফেরার পথে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি পিকআপ খাদে পড়ে প্রাণ হারান ৪২ স্কুলছাত্রসহ মোট ৪৫ জন।

- Advertisement -

সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ১৫ বছর পূর্ণ হলেও স্বজন হারানোর বেদনা আজও একটুও মলিন হয়নি। একই সঙ্গে সে সময় দেওয়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত না হওয়ায় ক্ষোভ ও আক্ষেপ রয়ে গেছে স্থানীয়দের মধ্যে।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন ছিলেন আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়া আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারজন, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার দুইজন, প্রফেসর কামালউদ্দিন চৌধুরী কলেজের দুই শিক্ষার্থী, একজন অভিভাবক এবং দুইজন ফুটবলপ্রেমী যুবক নিহত হন।

একসঙ্গে এত প্রাণহানির সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারেননি প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতদের স্বজনরা।

নিহত শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিনের মা কোহিনুর বেগম বলেন, “১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মনে হয় এই তো সেদিন খেলা দেখতে বের হয়েছিল আমার ছেলে। সন্তানের শোক কোনোদিন ভোলার নয়।”

আরেক নিহত শিক্ষার্থী আমিন শরীফের বাবা শাহজাহান জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি প্রবাসে ছিলেন। ছেলের শেষ মুখটিও দেখতে না পারার কষ্ট আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দুর্ঘটনাস্থলে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’ দেখলেই বুক ফেটে কান্না আসে বলে জানান তিনি।

বেঁচে ফিরেও ভুলতে পারেননি সেই বিভীষিকা

দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া তৎকালীন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহরাব হোসেন স্মৃতিচারণ করে বলেন,

“জয়ের আনন্দে আমরা এতটাই মগ্ন ছিলাম যে কখন গাড়িটি উল্টে পানিতে পড়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। চারদিকে অন্ধকার, দমবন্ধ করা পরিবেশ। সবাই প্রাণ বাঁচাতে ছটফট করছিল। আমি কোনোভাবে বের হতে পারলেও আমার সহপাঠীরা আর ফিরতে পারেনি।”

তিনি বলেন, নিজের বেঁচে থাকার চেয়ে বন্ধুদের হারানোর যন্ত্রণা আজও তাকে বেশি কষ্ট দেয়।

সন্তানের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাবা

আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে নিহতদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ‘আবেগ’ নামের স্মৃতিস্তম্ভ। এর নির্মাতা নিজাম মেস্ত্রি নিজেও ওই দুর্ঘটনায় নিজের সন্তানকে হারিয়েছেন।

তার ভাষায়, “আমার ছেলে মারা যায়নি। এই স্মৃতিস্তম্ভের মধ্য দিয়ে সে মানুষের আবেগ হয়ে বেঁচে থাকবে।”

১৫ বছরেও পূরণ হয়নি প্রতিশ্রুতি

দুর্ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা মিরসরাইয়ে গিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত শোকসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল—

১১ জুলাইকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা,
আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণ,
শিক্ষার্থীদের জন্য বিআরটিসি বাস চালু।

কিন্তু দেড় দশক পরও এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি। তবে মিরসরাই স্টেডিয়ামকে মিনি স্টেডিয়ামে উন্নীত করার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

শ্রেণিকক্ষ সংকটে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত

আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বিদ্যালয়ের জন্য দ্রুত একটি বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণসহ পূর্বের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান।

মামলা, সাজা ও চালকের মৃত্যু

দুর্ঘটনার পরদিন ১২ জুলাই ২০১১ সালে পিকআপ চালক মফিজুর রহমানকে আসামি করে মিরসরাই থানায় মামলা দায়ের করেন তৎকালীন মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির আহমদ নিজামী।

পরে ২১ জুলাই বরিশালের কাউনিয়া থেকে চালক মফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। সাজা ভোগ শেষে ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়।

আজ নানা আয়োজনে স্মরণ

মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শনিবার সকালে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্যোগে কোরআন খতম, স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা এবং তবারক বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

এসব অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, নিহতদের পরিবারের সদস্য, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও মিরসরাইয়ের সেই শোকাবহ দিনটি শুধু একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়; এটি নিরাপদ সড়কের দাবি, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস এবং অসংখ্য পরিবারের না-ফেরা প্রিয়জনদের চিরন্তন বেদনার প্রতীক হয়ে আছে।

সর্বশেষ

এই বিভাগের আরও