সংঘাত নয়, বরং সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বহুপাক্ষিকতা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং দেশে গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ও ২০২৬ সালের নির্বাচন:
ভাষণের শুরুতেই স্বাধীন বাংলাদেশের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণতন্ত্রকামী জনগণ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “দেড় দশকের বেশি সময়ের সংগ্রামের পর বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। জনগণই আমাদের সকল ক্ষমতার উৎস।” ভাষণে তিনি তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি, ফিলিস্তিন ও বিশ্ব রাজনীতি:
বিশ্বায়ন ও চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “যে কোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তি, শিক্ষা ও মানবতা হোক পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার।” স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন:
দীর্ঘ নয় বছর ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক চাপের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই। তাদেরকে নিজ মাতৃভূমিতে সসম্মানে ফিরিয়ে নেওয়াই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।” একইসঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা তহবিলের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কম কার্বন নিঃসরণ করেও বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় দেশে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা জানান তিনি।
জাতীয় পুনর্গঠন ও ‘৩১ দফা’ বাস্তবায়ন:
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনে সরকার ‘3-R’ (Recovery, Restoration, Reconstruction) কৌশল অনুসরণ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। জনগণের সামনে উপস্থাপিত সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর প্রায় ১০০ শতাংশই জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি (SDG) লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
তিনি আরও জানান, নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে, পাশাপাশি ফার্মার্স ও ই-হেলথ কার্ড সমন্বয় করে ভবিষ্যতে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা, বিনামূল্যে টিফিন ও ইউনিফর্ম প্রদান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংক্রান্ত প্রযুক্তির সুষম বন্টনে বৈশ্বিক নীতিমালার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন এক সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বাস করবে। আমাদের মূল লক্ষ্য—’সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’।”

