বাজারে ঢুকেই থমকে যাচ্ছেন ক্রেতারা। হাতে থলে, মনে হিসাব—তবু শেষ পর্যন্ত থলে ভরছে না আগের মতো। কেউ মাছের বদলে ডিম তুলে নিচ্ছেন, কেউ এক কেজির জায়গায় কিনছেন আধা কেজি, আবার কারও তালিকা থেকে বাদ পড়ছে একের পর এক পণ্য।
শুক্রবার দুপুরে নগরের বহদ্দারহাট, চকবাজার ও কাজীর দেউড়ি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা মিলল এই চিত্রের। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দূরপাল্লার পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবই এখন গিয়ে পড়ছে ক্রেতার পকেটে।
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। বেশির ভাগ সবজিই এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বরবটি, শিম, করলা, টমেটো, বেগুনসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। গাজর বিক্রি হচ্ছে দেড় শ ছুঁইছুঁই দামে, কাঁচা মরিচ আর ধনেপাতা তো রীতিমতো চড়া—কেজিতে ২০০ টাকার কাছাকাছি। যে পেঁপে বা মিষ্টি কুমড়ার দাম এখনো কিছুটা নাগালে, তাও যেন স্বস্তি নয়, বরং ব্যতিক্রম।
মাছের বাজারেও একই সুর। রুই-কাতলা থেকে শুরু করে ইলিশ, চিংড়ি কিংবা রূপচাঁদা—সবকিছুর দামই সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে। ছোট মাছ তেলাপিয়া-পাঙাশও এখন আর সস্তা নয়। রূপচাঁদা ও চিংড়ির দাম শুনে অনেকেই আঁতকে উঠছেন—কেজিতে দাম উঠেছে হাজার টাকার কোঠায়।
বহদ্দারহাটে বাজার করতে আসা মোহাম্মদ আরিফ উদ্দিনের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়েনি এক টাকাও। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন সেই টাকায় কয়েক দিনও চলে না।
ডিম-মাংসের বাজারেও একই চাপ। ব্রয়লার মুরগির দাম সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা, সোনালি-কক-লেয়ার সবকিছুরই দাম ঊর্ধ্বমুখী। গরু ও খাসির মাংসের দামও আগের মতোই চড়া। আর সবচেয়ে সহজলভ্য প্রোটিন হিসেবে যে ডিমের ওপর মানুষ ভরসা করত, তার দামও বেড়েছে ডজনে প্রায় ১০ টাকা।
কাজীর দেউড়ি বাজারের এক ক্রেতা খানিকটা ক্ষোভ নিয়েই বলেন, মাছের দাম বেশি, মাংসের দাম বেশি, সবজিও কম নয়—শেষমেশ ডিম কিনে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করেন, সেখানেও এখন দাম বাড়তি।
তবে ব্যবসায়ীদেরও নিজস্ব যুক্তি আছে। রেয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, তাঁরাও বেশি দামে পণ্য কিনছেন। দূরের জেলা থেকে পণ্য আনতে পরিবহন খরচ বেড়েছে, ট্রাকভাড়ার ওপরই অনেকটা নির্ভর করে বাজারদর। ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে চান না, তাঁরাও বাড়তি দামে বিক্রি করতে চান না—কিন্তু আড়ত থেকে বেশি দামে কিনলে খুচরায় কিছুটা বাড়তি না রেখে উপায় থাকে না।
বাজারের এই অস্থিরতা নিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁর মতে, অজুহাত দেখিয়ে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ কারও নেই। কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার পেছনে উৎপাদন, পাইকারি ক্রয়মূল্য, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রকৃত খরচ কতটা বেড়েছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
এমনকি একই পণ্য এক বাজারে এক দামে আর অন্য বাজারে ভিন্ন দামে বিক্রি হওয়ার বিষয়টিও নজরদারির বাইরে থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, আয় না বাড়লেও যদি নিত্যপণ্যের ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ অবশ্য আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াতে পারবেন না।
বাজারে ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঠিক কাগজপত্র রাখতে হবে, বিক্রি করতে হবে যৌক্তিক দামে। কোথাও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

