বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব ও জেওসিএল লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব। তিনি বলেন, এমন সিদ্ধান্তেই কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের সমর্থন থাকবে।
জ্বালানিখাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানি বন্ধ ও ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয় ‘যমুনা ভবনে’ এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের আয়োজনে এই কর্মসূচিতে তেলখাতের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’
সমাবেশে মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, সম্প্রতি বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আমরাও তা-ই বলতে চাই। আগে থেকেই দেশে বেসরকারি পর্যায়ে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে। তবে এবার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রেও যেন সেই নীতিই গুরুত্ব পায়।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকদের অধিকারের পাশাপাশি দেশ ও জনগণের কল্যাণ-স্বার্থ রক্ষা করেই প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। “এতেই কেবল সমর্থন থাকবে শ্রমিক-কর্মচারীদের,” যোগ করেন তিনি।
‘কুচক্রী মহলের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ
মুহাম্মদ এয়াকুব অভিযোগ করেন, শ্রমিক অধিকার খর্ব করে জ্বালানিখাতকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে সরকারের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি কুচক্রী মহল। তিনি বলেন, অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদ্যমান ২২টি সুনির্দিষ্ট সুবিধা কর্তনের চেষ্টা চলছে। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে গড়িমসি করা হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানিখাতে শ্রম আইনকে শ্রমিকবান্ধবের পরিবর্তে শ্রমিকবিরোধী রূপ দেওয়ারও তোড়জোড় চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, “সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলছে এবং এজন্য নানামুখী উদ্যোগও নিচ্ছে। কিন্তু জ্বালানিখাতে ঘটছে এর উল্টোটাই। বিপিসির আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, এসএওসিএল ও এলপিজিসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে শ্রমিকদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বদলে কমানোর পাঁয়তারা চলছে।”
শ্রমিক নেতাদের বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের পথ রুদ্ধ করারও চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, “শ্রমিক-কর্মচারীরা জ্বালানিখাতে শান্তি চায়। কিন্তু আমরা শান্তি চাইলেও সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি কুচক্রী মহল শ্রমিকদের অধিকার কেড়ে নিয়ে এই খাতে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। আমরা সাফ জানিয়ে দিতে চাই, জ্বালানিখাতে কাউকে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা কেবল তাদের ন্যায্য অধিকার চায়, হয়রানি বন্ধ চায়, অযাচিত হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ চায়।”
সভাপতিত্ব ও উপস্থিতি
যমুনা অয়েল কোম্পানি লেবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন—পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি জসিম উদ্দিন, এলপিজি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মনির হোসেন, বিপিসির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, পদ্মা অয়েল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক সেলিম কবির চৌধুরী, যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ মন্নান।
যেসব কারণে এই কর্মসূচি
প্রতি দুই বছর অন্তর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে বিপিসির তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা যুগোপযোগী করা হয়। কিন্তু সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদ ১৯ মাস পার হয়ে গেলেও কোম্পানিগুলোর অবহেলা ও গড়িমসির কারণে নতুন চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে না।
এছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে গত ১৭ জুন বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোর জন্য ‘প্রান্তিক সুবিধা নীতিমালা-২০২৬’ (খসড়া) প্রণয়নের নামে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিদ্যমান ২২টি সুবিধা কাটছাঁটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একইসঙ্গে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ (অদ্যাবধি সংশোধিত)-এর ২(৬২) ধারায় সংজ্ঞায়িত ‘শিল্প বিরোধ ও শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ সংক্রান্ত ২০৯, ২১০ ও ২১১ ধারা রহিত করার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতিনিধি সিবিএ নেতাদের ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
আরও অভিযোগ, খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে গত ২৬ জুলাই জারি করা এক অফিস আদেশের মাধ্যমে বিপিসির পরিচালককে (অপারেশন) আহ্বায়ক করে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার কাজ তেল বিপণন কোম্পানিগুলোতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম মনিটরিং ও জবাবদিহি সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন। স্পর্শকাতর এই খাতের শ্রমিকদের মধ্যে এ উদ্যোগ উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর বাইরে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত ঠিকাদার-শ্রমিকরা ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে অল্প বেতনে কাজ করলেও স্থায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

