নিজের গুমের ৬১ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, চোখ ও হাত বেঁধে তাকে সীমান্ত পার করে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তার শারীরিক অবস্থা, দাড়ি ও ময়লা পোশাক দেখে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুম অবস্থায় প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে হতো, পরের ভোরটি দেখতে পারবেন কি না। বন্দিদশায় দিনের আলো দেখার সুযোগ ছিল না। সকালের নাশতা এলে বুঝতেন সকাল হয়েছে। নখের আঁচড় দিয়ে দেয়ালে দাগ কেটে কেটে তিনি দিন গুনতেন।
তিনি বলেন, “আমার গুমের ৬১ দিন—তার যত মিনিট, যত মুহূর্ত কেটেছে, তার প্রত্যেকটা যদি আমি লিখে রাখতে পারতাম, তাহলে তা কোনো কিতাবের সংকলনের মতো হতো।”
কবরের মতো কক্ষে ৬১ দিন
গুমকারীরা তাকে প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের একটি সংকীর্ণ কক্ষে আটকে রেখেছিল বলে জানান তিনি। জায়গাটি অনেকটা কবরের মতো ছিল। সেখানে একটি পানির কল ও প্রস্রাব-পায়খানার জন্য একটি ছিদ্র ছিল। দুর্গন্ধের পাশাপাশি বিষাক্ত পোকামাকড়ও দেখা যেত।
মেঝেতে কম্বল পেতে ঘুমাতে হতো এবং পাতলা একটি বালিশ দেওয়া হয়েছিল। নিয়মিত খাবার, পানি ও ওষুধ দেওয়া হলেও অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার সুযোগ মিলত না বলে জানান তিনি।
অসুস্থ হলেও চিকিৎসা মেলেনি
সালাহউদ্দিন বলেন, একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে খাবার দিতে এসে তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা খোলা হয়। পরে গামছা দিয়ে তাকে টেনে তোলা হয়। বুকের তীব্র ব্যথার কথা জানালে তাকে বলা হয়, সেখানে ডাক্তার আসা নিষেধ।
পরে তাকে অন্যত্র নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেদিন সকালে পানি কম খেতে বলা হলে তার মনে হয়েছিল, হয়তো সেটিই তার জীবনের শেষ দিন।
চোখ বেঁধে মাইক্রোবাসে
তিনি জানান, মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে এবং হাত পেছনে বেঁধে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। গাড়িতে আরও কয়েকজন ছিলেন বলে ধারণা করেন তিনি।
কয়েক ঘণ্টা যাত্রার পর তাকে অন্য একটি গাড়িতে তোলা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটি উঁচু এলাকায় নেওয়া হলে মানুষের হিন্দিতে কথা বলার শব্দ শুনে তিনি নিশ্চিত হন, তাকে ভারতের কোনো এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শিলংয়ে নামিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভোরের দিকে শিলংয়ের একটি এলাকায় নিয়ে গিয়ে তার চোখ খুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, সেটি শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা।
সেখানে নির্জন একটি এলাকায় তাকে ফুটপাতে নামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ।’
তখন তার পা ফুলে যাওয়ায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। আশপাশের মানুষের কাছে সাহায্য চাইলে তার দাড়ি, ময়লা পোশাক ও শারীরিক অবস্থা দেখে অনেকে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করেছিলেন বলে জানান তিনি।
পুলিশের কাছেও প্রথমে পরিচয় দিতে পারেননি
পরে পুলিশ তাকে একটি বিট হাউসে নিয়ে যায়। নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও প্রথমে পুলিশ তাকে বিশ্বাস করেনি বলে জানান সালাহউদ্দিন। এরপর তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে নেওয়া হয় নর্থ ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সায়েন্সেসে।
সেখানে এক চিকিৎসককে নিজের পরিচয় ও বাংলাদেশের পরিবারের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের অনুরোধ করেন তিনি।
স্ত্রীর ফোনে নিশ্চিত হয় পরিচয়
একপর্যায়ে তার দেওয়া নম্বরে বাংলাদেশে ফোন করার চেষ্টা করা হয়। তার স্ত্রী প্রথমে ফোন ধরতে না পারলেও পরে বিদেশি নম্বর দেখে কলব্যাক করেন।
সালাহউদ্দিন বলেন, ফোনে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তার স্ত্রী চিৎকার করে বলেন, ‘আমি জান্নাত পেয়ে গেছি।’
ওই মুহূর্তটিকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’
পরে তাকে শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকের মাধ্যমে তার মানসিক সুস্থতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পুলিশের নজরদারির মধ্যেও একটি ভারতীয় টেলিভিশন ক্যামেরায় তাকে দূর থেকে ধারণ করা হয়। সেখানে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য তিনি বলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’ পরে সেই ভিডিও বাংলাদেশে প্রচারিত হয়।
এরপর তাকে ভারতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেরার পথ তৈরি হয়।
দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরতে পারার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, “আপনারা দীর্ঘ ফ্যাসিজম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন, বাংলাদেশটাকে মুক্ত করেছেন। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছেন।”

