সমাজে মানবিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকাতে ব্যক্তিস্বার্থের চর্চা থেকে বেরিয়ে বিবেকের চর্চায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
আজ মঙ্গলবার পটিয়ায় সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সুধীজন ও উপকারভোগীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, অন্যের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করলেও নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। পরিবর্তন আনতে হলে প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা এমন একটা সময় পার করছি, যখন মূল্যবোধ ও মানবিকতার ভয়াবহ অবক্ষয় হচ্ছে। আমরা বিবেকের চর্চা থেকে দূরে সরে এসেছি। আমাদের চিন্তাভাবনা এখন নিজের স্বার্থের চর্চাকে ঘিরে।’
সেবা নেওয়ার সময় মানুষ নিজের প্রাপ্তির বিষয়ে সচেতন থাকলেও সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে একই দায়িত্ববোধ প্রায়ই দেখা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করিম কী করল, রহিম কী করল—সেটা না ভেবে আমার কী করা উচিত, সেটি যদি আমি ভাবি, তাহলে পরিবর্তন হবে।’
মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিজের স্বার্থের বাইরে সমাজ ও মানুষের প্রতিও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ৪০ কেজির একটি বস্তা তুলতে কষ্ট হলেও ৬০ কেজি ওজনের সন্তানকে কোলে নিতে সেই কষ্ট অনুভূত হয় না—কারণ সন্তানের প্রতি মায়া আছে। সমাজের মানুষের প্রতিও এমন মমত্ববোধ তৈরি করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে আরও আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু সকাল ৯টায় অফিসে এসে বিকেল ৫টায় চলে যাওয়ার মানসিকতা নিয়ে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। মানুষের মধ্যে সরকারি দপ্তর থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার আস্থা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তা তাঁর কর্মক্ষেত্রে নতুন কী যোগ করলেন এবং তাঁর কাজের মাধ্যমে সমাজ ও দেশ কতটা উপকৃত হলো, সেটিও ভাবতে হবে।
সেবাপ্রত্যাশীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আইনের বাইরে গিয়ে কারও সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, তবে আইনের মধ্যে যতটুকু করা সম্ভব, তা করতে হবে এবং সমাধান সম্ভব না হলেও সঠিক পরামর্শ দিতে হবে।
সরকারি প্রকল্পে অর্থের অপচয় রোধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না, তা মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, সেটিও দেখতে হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো অর্থের যেন অপচয় না হয়। প্রতিটি চালের হিসাব আমরা চাই। প্রতিটি জায়গায় সততা ও স্বচ্ছতা দেখতে চাই।’
তরুণ প্রজন্মকে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু ভালো ফল বা ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
মাদকসহ সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণ পরিবর্তনের আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আপনি রাত ১২টায় ফিরবেন আর বলবেন, আমার সন্তান সন্ধ্যা ৬টায় ফিরবে—এটা কি হয়? আপনাকে পরিবর্তন হতে হবে, আমাকে পরিবর্তন হতে হবে।’
ইসলামী ব্যাংক ও এস আলমের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারানো ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রশাসক বলেন, মানবিক বিবেচনায় তাঁদের কথা শোনা হয়েছে এবং বিষয়টি যথাযথ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। তবে দাবি আদায়ে আইন লঙ্ঘন বা সড়ক বন্ধ করে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটানোর আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমরা সমাজের চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করে আগামী দিনে একটি নতুন বাংলাদেশ, একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে আপনি-আমি এবং আমাদের সন্তানেরা নিরাপদে বসবাস করবে।

